জনশক্তি রফতানিতে ধস : ৯ মাসে কর্মী কমেছে ৩৩ শতাংশ, রেমিট্যান্সেও টান মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও কূটনৈতিক স্থবিরতায়
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 11 Oct, 2026
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘায়িত সংঘাত এবং কার্যকর অভিবাসন কূটনীতির অভাবে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি খাত।সরকারের পক্ষ থেকে আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী পাঠানোর উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত।
চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর) বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে কর্মী যাওয়া কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি রেমিট্যান্স প্রবাহেও বড় ধরনের ভাটার টান শুরু হয়েছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম নয় মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেখানে ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন কর্মী গিয়েছিলেন, চলতি বছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে। অর্থাৎ মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে বিদেশে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন বাংলাদেশী।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রধান স্তম্ভ সৌদি আরবেই ধস নেমেছে সবচেয়ে বেশি। গত বছরের নয় মাসে দেশটিতে ৫ লাখ ৬৮ হাজারের বেশি কর্মী গেলেও চলতি বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৭ হাজারে—হ্রাসের হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।
এছাড়া আঞ্চলিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাবে কাতার ও কুয়েতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতেও নতুন নিয়োগের চাহিদা প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। কাতারে কর্মী পাঠানো কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ এবং কুয়েতে কমেছে ৩৫ শতাংশের বেশি। এর বাইরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিসা জটিলতা ও হঠাৎ করে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ প্রবাসীর ভিসা বাতিলের ঘটনায় দেশটির বাজার কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার অন্যতম প্রধান গন্তব্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। ২০২৪ সালের মে মাসে বাজারটি বন্ধ হওয়ার পর সম্প্রতি "দুই লাখ কর্মী নেওয়ার" যে খবর চাউর হয়েছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নাকচ করে দিয়েছেন মালয়েশিয়ার যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল। উপরন্তু, মালয়েশিয়ার নিজস্ব পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বিদেশি শ্রমিকের কোটা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার নীতি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একইভাবে জাপানে লাখো কর্মী পাঠানোর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবতা বলছে, চলতি বছরের নয় মাসে দেশটিতে কর্মী যেতে পেরেছেন মাত্র ১ হাজার ৬০৮ জন। অথচ সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গত বছর ২৫ মে জাপান সফরে গিয়ে ঘোষণায় বলেছিলেন, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক লাখ শ্রমিক নেবে জাপানি কর্তৃপক্ষ ও ব্যবসায়ীরা।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল যুদ্ধ বা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা ও দুর্বল অভিবাসন কূটনীতি এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিদেশে কর্মী পাঠানোর জন্য দেশে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) সচল থাকলেও আন্তর্জাতিক মান ও সুনির্দিষ্ট চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের কোনো সমন্বয় নেই। অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থী প্রশিক্ষণ নিলেও তাদের বিদেশে যাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে না। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় ও ভিসা বাণিজ্যের সিন্ডিকেট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
জনশক্তি রফতানির এই ধারাবাহিক মন্দা সরাসরি আঘাত হানছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বছরের শুরুর দিকে প্রতি মাসে যেখানে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের বেশি প্রবাসী আয় দেশে আসত, গত চার মাস ধরে সেই মাইলফলক স্পর্শ করা সম্ভব হয়নি। সেপ্টেম্বর মাসে এসে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশে, যা সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল কাগুজে লক্ষ্যমাত্রা কিংবা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এখন প্রয়োজন জোরালো অভিবাসন কূটনীতি।
মধ্যপ্রাচ্যের ওপর একমুখী নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার অপ্রচলিত কিন্তু টেকসই বাজারগুলোতে দক্ষ জনবল পাঠানোর কৌশলগত রোডম্যাপ বাস্তবায়ন না করলে দেশের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স—উভয় সংকটই আরও ঘনীভূত হবে।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

